প্রশ্নঃ বন্যা গল্পের নামকরনের সার্থকতা আলোচনা করো।
************************************
সাহিত্যকর্মের
নামকরণ সব সময় এক ধারায় হয় না, কখনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে, কখনো চরিত্র কেন্দ্রিক,
কখনো গল্পের কোনো ভাব ভাবনা কিংবা বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে নামকরণের অবলম্বন। কখনো আবার
অন্তর্নিহিত কোনো ইঙ্গিত প্রবণতাও নামকরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বক্ষ্যমাণ গল্প বন্যা
নামকরণের ক্ষেত্রে দেখা যায় গল্পকার নায়ক-নায়িকা বা কেন্দ্রীয় চরিত্রের নামানুসারে
গল্পটির নামকরণ করেননি। এর শিরোনাম অন্তর্নিহিত একটি ভাবের ইঙ্গিতকে ভিত্তি করে করা
হয়েছে।
বন্যা গল্পের মূল পটভূমি বিহারের
বিখ্যাত কুশি নদীর তীরে একটি প্রান্তিক গ্রাম রহিকপুরা। রহিকপুরা গ্রামের মানুষদের
বন্যায় বিপর্যস্ত অবস্থা হয়। “কুশি নদীতে বান আসিয়াছে; একরকম নোটিশ না দিয়াই”।...
বন্যা আসার কারণ হিসেবে এখানকার মানুষরা মনে করে কোন পাপে ভগবান তাদের এই শাস্তি দিতেছেন।
এই গ্রামের মেয়েরা শেষ রাতে ওঠে। তারা কেউ আঙ্গিনার বাইরে যেতে পারে না। এবং আঙিনাতে
নামতে পারে না। চারিদিকে শুধু জল। হঠাৎ উপস্থিত হওয়া বন্যাতে দিশেহারা এই গ্রামের
মানুষগুলো চেষ্টা করে নিজেদের যেটুকু সহায়-সম্বল আছে সেটুকু নিয়ে বাঁচতে। দিশেহারা
এই মানুষগুলো নিজেদের সংসারের জিনিসপত্র বাঁচাতে বিপর্যয়ের মধ্যেও প্রাণান্ত চেষ্টা
করে। বন্যার মতো ভয়ঙ্কর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবনকে তছনছ করে দেয়। এই বন্যার
ফলে এই গ্রামের ভিন্ন ভিন্ন জাতি সম্প্রদায়ের মানুষের আচার-আচরণ, রীতিনীতি সংস্কার
এবং সর্বোপরি তাদের সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের কথা উঠে আসে। বন্যা পরিস্থিতির মতই রহিকপুরা
গ্রামের শ্রেণির সংঘাতকে তুলে ধরেছেন লেখক। ব্রাহ্মণ, তিয়র, ধাত্তর, বাঁতার প্রভৃতি
জনজাতির মানুষের বসবাস রহিকপুরা গ্রামে। এদের প্রত্যেকের চালচলন মুখের ভাষা এবং জাতিগত
বৈশিষ্ট্যের কথা আমরা জানতে পারি এই বন্যার কারণে।
গ্রামের সবচেয়ে অবস্থাপন্ন দুটি
পরিবার হল সুশৃৎ তিন্নর যে তিয়র সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে, আর নৌখে ঝা যে ব্রাহ্মণ
সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। এদের মধ্যে বন্যার পূর্বে মিল ছিল না। ব্রাহ্মণরা নিজেদেরকে
উচ্চশ্রেণির বলে সকলের থেকে পৃথক মনোভাব পোষণ করে। তিয়র রাও নিজেদেরকে কোন অংশে কম
মনে করে না। এছাড়া আছে শীর্ষাবাদিয়া নিজেদেরকে মুর্শিদাবাদের হাবসী খোঁজার বংশধর
বলে বেশ বড়াই করে কেউ তাদেরকে 'বাধিয়া' বললে তারা বলে জিব টোনে ছিঁড়ে ফেলবে। তবে
অন্যান্য জনজাতি থাকলেও রহিকপুরা গ্রামের মূল লড়াই রেষারেষি ব্রাহ্মণ আর তিনর সম্প্রদায়ের
মধ্যে। গ্রামের দুই আস্থাবান সুমৃৎ তিয়র ও নৌখে বা এই দুই পরিবারের মধ্যে রেষারেষি
ঝগড়া ফৌজদারি নিত্য লেগেই ছিল। প্রথমে ছিল দুইজনের পিতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত, পরের
দাঁড়ায় ব্রাহ্মণ এবং তিয়র দুই জাতির মধ্যে। তবে জাতপাতের দ্বন্দ্ব থাকলেও বিপদের
সময় রহিকপুরা গ্রামের সকলে একসঙ্গে মোকাবিলা করেছে। কুশী নদীতে বান এলে সকলে আপাত
হিংসা ঈর্ষা ভুলে সঙ্গবদ্ধ হয়ে বন্যার জলের সঙ্গে মোকাবিলা করে। উঁচু জাতির মহিলাদের
প্রতি সম্মান দেখিয়ে নিচু জাতের মহিলারা তাদের কাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
তিয়র গিন্নির ঝা আসন্ন প্রসবা পুত্রবধূর উদ্দেশ্যে বলে “ভয় কী? কৌশিকী মায়ের কৃপায়
সব ঠিক হয়ে যাবে।" একজন আসন্ন প্রসবা নারী এবং তার পরিবারের পাশে বিপদের মধ্যে
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু গ্রামে জল নেমে গেলে আবার তারা পূর্বের অবস্থানে
ফিরে আসে। আবার হিংসা-বিদ্বেষ শুরু হয়ে যায়।
গল্পটির নাম বন্যা। বন্যা একটি প্রাকৃতিক
বিপর্যয়। রহিকপুরা গ্রামে, বন্যা আসায় এখানে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতি সম্প্রদায় পরস্পরের
মধ্যে বিবাদ ভুলে এক হয়ে যায়। একদিন তারা পরস্পরের সঙ্গে হিংসা বিবাদ করে আলাদা ছিল
কেউ কারো মুখ পর্যন্ত দর্শন করত না। একমাত্র বন্যা এদের পেরেছে এদের মধ্যে মিল মহব্বত
তৈরি করতে। পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে যে বিবাদ ছিল যে হিংসা ছিল তা তারা ভুলে গেছে। তারা
এক হয়ে গেছে। লেখক বলেছেন “এ কয়দিন বন্যার স্রোতে, গ্রামের মনের পঙ্কিলতা ভাসাইয়া
লইয়া গিয়াছিল। প্লাবনের বিশালতার মধ্যে গ্রামীণ মনের সংকীর্ণতার স্থান ছিল না। পরের
দিন গোবরাহা দিয়ারার কালো মাটি জলের মধ্য হইতে মাথা চাড়া দিয়া উঠে। সঙ্গে সঙ্গে
এই কয়দিনের অবচেতন স্বার্থলোলুপ কিষাণ মন আবার চেতন হইয়া উঠে। অস্বাভাবিক পরিবেশের
সমাপ্তির সহিত স্বাভাবিক গ্রামীণ মনও মাথা চাড়া দিয়া উঠে। বন্যার জল সরিতেছে—রাখিয়া
যাইতেছি কুটিল সংকীর্ণ মনের ঈর্যাদ্বন্দ্বের উর্বর ভূমি; কলাইয়ের ও কলহের ফসলের উপযুক্ত
ক্ষেত্র।”
অর্থাৎ বন্যা যেমন এই গ্রামের সকল মানুষকে এক জায়গায় এনেছিল আবার বন্যা চলে যেতেই
গ্রামের মানুষগুলো পৃথক হয়ে গেছে। যে সংকীর্ণ মানসিকতা সেটা আবার ফুটে উঠেছে। বন্যা
কিন্তু পেরেছে তার বিশালতাকে দিয়ে সংকীর্ণ মানসিকতাকে ধুয়েমুছে সাফ করে দিতে। বন্যা
শিখিয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে বিপদের দিনে কিভাবে লড়াই করতে হয়।
প্রকৃতিতে বন্যা সরে যেতেই কালো কাদামাটি বেরিয়ে এসেছে মানুষের মধ্যেও মলিনতা সংকীর্ণ
বেরিয়ে এসেছে। তাই বন্যা একটি অন্তর্নিহিত ভাবকে ব্যঞ্জিত করেছে। গল্পটির নামকরণ ব্যানা
ধর্মী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। বন্যা মানুষের জীবনে কখনো মিল আবার কখনো দ্বন্দ্ব
সৃষ্টি করেছে। তাই নামকরণটি সার্থক ও সর্বাঙ্গসুন্দর বলা যেতে পারে।
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই
আমাদের প্রতিশ্রুতি
6295916282;
7076398606
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি
অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।