প্রশ্নঃ একেই কি বলে সভ্যতা? নাটকে নব্য সমাজের
লাম্পট্য, ভন্ডামি ও যে সামাজিক চিত্র ফুটে উঠেছে তা লেখ।
মাইকেল
মধুসূদন দত্তের 'একেই কি বলে সভ্যতা?' (১৮৬০) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক সামাজিক
প্রহসন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বাংলার নবজাগরণের ফলে যে নব্য শিক্ষিত 'ইয়ং বেঙ্গল'
বা নব্য বাবু সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল, তাদের চরম নৈতিক অধঃপতন, মদ্যপান ও বেশ্যাসক্ত
জীবন এবং মেকি আধুনিকতাকে নাট্যকার এখানে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবচ্ছেদ করেছেন।
'একেই
কি বলে সভ্যতা' নাটকে নব্য সমাজের লাম্পট্য, ভণ্ডামি ও সামাজিক চিত্রের প্রতিফলনঃ
ঊনবিংশ
শতাব্দীতে হিন্দু কলেজের প্রভাবে একদল তরুণ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠে। তারা
যুক্তিবাদ ও প্রগতির কথা বললেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বাহ্যিক আচার-আচরণকে অন্ধভাবে
অনুকরণ করতে শুরু করে। মধুসূদন নিজে এই আন্দোলনের অংশীদার হয়েও তাদের এই বিচ্যুতিকে
সমর্থন করতে পারেননি। নাটকটিতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে 'সভ্যতা'র দোহাই দিয়ে তৎকালীন
যুবসমাজ উচ্ছৃঙ্খলতাকে জীবনের অঙ্গ করে নিয়েছিল। নব্য শিক্ষিত এই সম্প্রদায়ের লক্ষ্য
ছিল হিন্দু ধর্মের যাবতীয় সংস্কার ভেঙে ফেলা, কিন্তু সেই সংস্কার ভাঙার পথ হিসেবে তারা
বেছে নিয়েছিল মদ্যপান ও নৈতিক বিচ্যুতিকে।
নাটকের
কেন্দ্রীয় চরিত্র নবকুমার এবং তার পারিষদদের জীবনে লাম্পট্যই ছিল আধুনিকতার শেষ কথা।
তাদের কাছে সভ্যতা মানেই হলো বাড়িতে সত্য কথা লুকানো আর বাইরে গিয়ে নিষিদ্ধ পল্লীতে
সময় কাটানো। নবকুমারের মতো যুবকেরা বিশ্বাস করত যে, গলার টাই, হাতে মদের গ্লাস আর বেশ্যাগমন
না করলে কেউ প্রকৃত 'আধুনিক' হতে পারে না। 'জ্ঞানযোগ' নামক সভার অন্তরালে তারা যে জঘন্য
আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত হতো, তা তাদের চারিত্রিক পঙ্গুত্বকেই প্রকাশ করে। তারা মনে করত
স্বাধীনচেতা হওয়ার অর্থই হলো পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি এবং লালসার
বশবর্তী হওয়া।
নাটকটিতে
মধুসূদন নব্য বাবুদের ভণ্ডামিকে অত্যন্ত তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। এই ভণ্ডামি দ্বিবিধ—প্রথমত, সমাজের চোখে
তারা শিক্ষিত ও মার্জিত; কিন্তু অন্ধকারের আড়ালে তারা কদর্য। দ্বিতীয়ত, তারা মুখে নারী
স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে নারীদের কেবলমাত্র ভোগের বস্তু হিসেবেই গণ্য করত। নবকুমার
তার স্ত্রীর কাছে অত্যন্ত অনুগত হওয়ার ভান করে, কিন্তু পরক্ষণেই সে তার বন্ধুদের সাথে
মদ্যপানে মত্ত হয়। এমনকি নিজের বাবার সামনেও সে মিথ্যে বলতে দ্বিধা করে না। এই দ্বিচারিতা
তৎকালীন শিক্ষিত সমাজের একটি কদর্য রূপকে তুলে ধরে। তারা নিজেদের 'সুসভ্য' বলে দাবি
করলেও তাদের অন্তরের কুরুচি ছিল অসভ্যতার নামান্তর।
নাটকটিতে
'জ্ঞানযোগ' নামক একটি সভার দৃশ্য রয়েছে, যা তৎকালীন বিভিন্ন সভার ব্যঙ্গাত্মক রূপ।
এই সভার মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা ছিল সমাজ সংস্কার বা জ্ঞানচর্চা, কিন্তু বাস্তবে তা
হয়ে দাঁড়িয়েছিল মদ্যপান আর নিষিদ্ধ আহারের আখড়া। সভায় উপস্থিত সভ্যদের আলোচনা ছিল অসংলগ্ন
এবং কুরুচিপূর্ণ। ইংরেজি বুলি আউড়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার এক হাস্যকর চেষ্টা
সেখানে দেখা যায়। মধুসূদন দেখিয়েছেন যে, এই যুবকেরা পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান বা দর্শনকে
গ্রহণ করেনি, বরং গ্রহণ করেছে শুধুমাত্র সুরা আর মাংসের প্রতি আসক্তিকে। তাদের এই বিকৃত
রুচিই ছিল নাট্যকারের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
নাটকটি
তৎকালীন কলকাতার ঘুণে ধরা পারিবারিক কাঠামোকেও উন্মোচন করে। নবকুমারের পিতা কর্তামশায়
একজন পরম বৈষ্ণব ও রক্ষণশীল মানুষ। কিন্তু তাঁর চোখের সামনেই তাঁর পুত্র গোল্লায় যাচ্ছে,
অথচ তিনি তা টের পাচ্ছেন না বা বুঝেও অসহায়। অন্যদিকে, অন্তঃপুরবাসিনী নারীদের চিত্রটি
অত্যন্ত করুণ। নবকুমারের স্ত্রী ও বোন জানে যে বাড়ির পুরুষরা ঘরের বাইরে কী ধরণের অনাচারে
লিপ্ত, কিন্তু সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা নীরব দর্শক মাত্র। এই পারিবারিক বিচ্ছেদ
এবং প্রজন্মের ব্যবধান নাটকটিতে এক গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
নব্য
শিক্ষিতরা মনে করত বাংলা ভাষা বা ভারতীয় সংস্কৃতি হলো আদিম ও অসভ্য। তাই তারা নিজেদের
মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলা এবং ইংরেজি আদব-কায়দা মেনে চলাকেই আভিজাত্য মনে করত। তাদের
এই আত্মবিস্মৃতি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, তারা নিজের শেকড়কে উপড়ে ফেলে এক কৃত্রিম পরিচয়ে
বাঁচতে চেয়েছিল। মধুসূদন এই নাটকে দেখিয়েছেন যে, শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী করার বদলে এই
নব্য শিক্ষিতদের উদ্ধত ও বিবেকহীন করে তুলেছিল। তারা পাশ্চাত্য আলোকপ্রাপ্তির বদলে
অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল।
নাটকের
শেষে দেখা যায়, নবকুমার মদমত্ত অবস্থায় জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছে। এই দৃশ্যটিই সমাজের সামনে
বড় প্রশ্ন চিহ্ন ছুঁড়ে দেয়। নাট্যকার বোঝাতে চেয়েছেন যে, বিবেকহীন লাম্পট্য, মা-বাবার
অবাধ্যতা, পরিবারকে ফাঁকি দেওয়া এবং মদ্যপান কখনোই সভ্যতার লক্ষণ হতে পারে না। প্রকৃত
সভ্যতা হলো নৈতিকতা, আত্মসংযম এবং আধুনিক মনস্কতার সমন্বয়, যা এই নব্য সমাজে অনুপস্থিত
ছিল।
মাইকেল
মধুসূদন দত্ত তাঁর প্রখর সমাজদৃষ্টির মাধ্যমে 'একেই কি বলে সভ্যতা?' নাটকে নব্য শিক্ষিত
যুবকদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, শিক্ষার আলো যদি চরিত্রের অন্ধকার
দূর করতে না পারে, তবে সেই শিক্ষা অর্থহীন। সমাজের এই চরম নৈতিক অবক্ষয় এবং ভণ্ডামির
চিত্রটি আজও আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় প্রাসঙ্গিক। মধুসূদনের এই কশাঘাত কেবল সমকালীন সমাজের
জন্য ছিল না, বরং তা চিরকালীন মানবচরিত্রের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।
জ্ঞ্যানজ্যোতি কোচিং সেন্টার
তোমাদের উজ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব আমরা, এটাই আমাদের প্রতিশ্রুতি
অনলাইনে কোচিং নিতে হলে এবং বিভিন্ন নোট নিতে হলে এই নাম্বারে কল করুন।